ইষ্টার্ণ সায়েন্স-টেক ইনফরমেশন ব্যাংক
পরমাণু জগতের অন্দর মহলের কিছু খবরা-খবর
-মুহাম্মাদ শেখ রমজান হোসেন
রাসায়নিক বিক্রিয়ার
কথা মানুষ জানে হাজার হাজার বছর ধরে। এক পদার্থ বিক্রিয়া করে দিব্যি আরেক পদার্থ
হয়ে যাচ্ছে। বাইরে লোহা ফেলে রাখলে জং পড়ে যাচ্ছে। আগুনে পুড়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে
ছাই-কয়লা। কোনো এক গাছের কষ লেগে ঝলসে যাচ্ছে ত্বক। এসব দেখতে দেখতেই মানুষের মনে
প্রশ্ন এসেছে, পদার্থ আসলে কেমন? প্রতিটা
পদার্থই কি আলাদা, নাকি এক পদার্থ থেকে তৈরি হতে পারে
আরেক পদার্থ? মূলে এমন কী আছে, যার
পরিবর্তনে লোহাকে বদলে দিয়ে বানায় মরিচা? প্রায় আড়াই
হাজার বছর আগেই এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন তখনকার বিজ্ঞানী-দার্শনিকেরা।
অ্যারিস্টটল
একটা প্রশ্ন তুলেছিলেন, একটা স্বর্ণখণ্ডকে কতবার অর্ধেক করলে
তার স্বর্ণসত্তা হারিয়ে যাবে? উত্তরটাও হাজির করেছিলেন
তিনি। নিশ্চয়ই এমন একটা সীমা আছে, যার থেকে ছোট করতে গেলে
স্বর্ণ আর স্বর্ণ থাকবে না। এই সীমার নাম দিয়েছেন ‘ন্যাচারাল
মিনিমাম’। প্রতিটা পদার্থের একটা ন্যাচারাল মিনিমাম থাকবে, যার
চেয়ে ছোট করতে গেলে একটা পদার্থ আর ওই পদার্থের গুণাবলি নিয়ে থাকবে না। এমন একটা
মৌলিক অবস্থায় চলে যাবে, যা সব পদার্থের জন্য একই।
অ্যারিস্টটলের
ধারণা হলো, সব পদার্থই আসলে একই জিনিস। এর সঙ্গে ‘ফর্ম’ বা অবস্থা জড়িত। ওই অবস্থার জন্য পদার্থ
নানা রূপ নেয়। কখনো পানি, কখনো রুপা, আবার কখনো পাথর বা মাটি। মূল অবস্থাও খুব বেশি নয়, মাত্র চারটা। আগুন, পানি, বাতাস ও মাটি।
অ্যারিস্টটলের আগে দার্শনিক
ডেমোক্রিটাস পদার্থের ক্ষুদ্রতম রূপ যে অ্যাটম বা পরমাণু, এমন একটা ধারণা
দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, সব পদার্থই আলাদা, প্রতিটি পদার্থের জন্য একটা ক্ষুদ্রতম একক আছে, যা আর ভাঙা যায় না, ছোট করা যায় না। এবং সেটাই
অ্যাটম।
ডেমোক্রিটাসের
ধারণা ঠিকও ছিল না। কারণ, ডেমোক্রিটাসের মতে প্রতিটি পদার্থের পরমাণুই আলাদা, অর্থাৎ
ভাতের পরমাণু খুব ছোট ভাতের টুকরো, এই ধারণা রাসায়নিক
বিক্রিয়াসহ নানা প্রাকৃতিক ঘটনা ব্যাখ্যাতেই ঝামেলা তৈরি করে।
অ্যারিস্টটল
যে ধারণার বাহক ছিলেন, তাঁরও শ দুয়েক বছর আগের অ্যাম্পেডোস্লেস থেকে
ধার করেছিলেন এই আইডিয়া। এই ধারণাকে ব্যবহার করে পদার্থের যে মূল কথা, বা মৌলিকতা, তাকে একটা ছকে বাঁধতে চেয়েছেন অ্যারিস্টটল।
যেকোনো পদার্থই আসলে ওই চার মৌলিক অবস্থার মিশ্রণ।
অ্যারিস্টটলের
এই ধারণা টিকে থাকে অনেক অনেক বছর। এমতে, এক পদার্থ অন্য পদার্থে রূপান্তর হয় তার
চার মৌলিক গুণাগুণে পরিবর্তন এলে। সে হিসাবে একটা প্রক্রিয়া আগের অবস্থায় আর ফিরে
যাওয়ার কথা না। কিন্তু আলকেমিস্ট বা ধাতুর কাজ করা মানুষেরা খুব ভালোভাবেই জানতেন
এমন অনেক প্রক্রিয়া আছে, যেখানে পদার্থের রূপ পরিবর্তন হলেও পরে
সেই রূপে আবার ফিরে যাওয়া যায়।
অ্যারিস্টটলীয়
ধারণা আধুনিক ইউরোপে আসার আগে নতুন একটা
অংশ যুক্ত হয়। ধারণাটি প্রবর্তন করেন অষ্টম শতাব্দীর আরব বিজ্ঞানী জাবির ইবনে
হাইয়ান। তাঁর দেওয়া মূলনীতি ছিল দুটি। একটাকে ডাকা হতো মার্কারি বা পারদ নামে, আরেকটা
সালফার। এই মার্কারি বা সালফার ঠিক আমাদের চেনা পারদ-সালফার নয়। মার্কারি
প্রিন্সিপলটা হলো ‘ঠান্ডা’ ও ‘ভেজা’। অন্যদিকে সালফার হলো ‘গরম’ ও ‘শুকনো’। ইংরেজিতে cool-moist ও hot-dry। এই চারটা ধর্ম চার মৌলিক পদার্থের মাঝামাঝি নতুন একটা অবস্থানের নির্দেশ
করে। আল জাবেরীয় এই সালফার-মার্কারি থিওরি অনুযায়ী এই চারটা ধর্মই তৈরি করে মূল
সাতটা ধাতু—স্বর্ণ, রৌপ্য,
তামা, টিন, লোহা,
সিসা ও পারদ।
সালফার-মার্কারি
থিওরির চার কোয়ালিটি নির্ধারণ করে দেয় কোন্ ধাতু কেমন হবে। যেমন লোহার গলনাঙ্ক
অনেক বেশি, ঘষা খেলে স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হয়, তাই এতে নিশ্চয় সালফার অংশ অর্থাৎ গরম-শুকনা অংশ বেশি।
অ্যারিস্টটলের
চার মৌল এবং জাবির ইবনে হাইয়ানের সালফার-মার্কারি—এ
মিলেই তৈরি হয় বহুল প্রচলিত তালিকা। একটা বর্গাকৃতির চার কোণে চারটি মৌলিক
পদার্থের এই তালিকাকেই বলা যায় প্রথম পর্যায় সারণি। এই ধারণায় নতুনত্ব যোগ করেন
ষষ্ঠদশ শতকে সুইস চিকিৎসা বিজ্ঞানী প্যারাসেলসাস। তিনি মার্কারি-সালফার থিওরিতে
নুন
(Salt) যোগ করে পর্যায়
সারণীর আরেকটু বিস্তৃত তত্ত্ব বানান। সালফার+মার্কারি+সল্টের প্যারাসেলসাসীয় এই
তত্ত্ব অনুসারে জাবির ইবনে হাইয়ান আল আরাবীর মতো শুধু নির্ধারিত ধাতুই নয়; এসব ধর্ম দিয়ে অন্য সব পদার্থও তৈরি হয় ।
সপ্তদশ
শতকে পিয়েরে গ্যাসেন্দি আবার ডেমোক্রিটাসের অবিভাজ্য পরমাণুর ধারণা ফিরিয়ে আনেন।
ইত্যবসরে মিঃ দে কার্তে প্রস্তাব করেন আস্ত এক মেকানিক্যাল বা যান্ত্রিক বিশ্বের।
এরি মধ্যে রবার্ট বয়েল “সল্ট
বলে আসলে কিছু নেই”- এই বলে আল জাবেরীয় প্রথম আলকেমি আর
রসায়নের মধ্যে একটা সীমা রেখা টেনে দেন যাতে নিহিত ছিল পরমাণু-অণু-রাসায়নিক
বিক্রিয়ার মতো কিছু ফিজিও-কেমিস্টের ধারণা-বিশ্বাস।
কিন্তু
এর মধ্যেই জোসেফ প্রিস্টলি বাতাসের গ্যাসগুলোকে আলাদা করতে সক্ষম হন। ল্যাভয়সিয়ে
১৭৭৭ সালে ৩৩টা মৌলিক পদার্থের তালিকা প্রকাশ করেন। প্রথমবার আলাদা করেন ধাতু ও
অধাতুর মধ্যে।
১৮০৩ সালে জন ডাল্টন প্রস্তাব করেন ‘ডাল্টন’স ল’। এরপরই
আস্তে আস্তে মৌলিক পদার্থের সত্যিকার ধারণা মানুষ বুঝতে শুরু করে। মৌলিক
পদার্থগুলোকে আলাদা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর যত দিন
গিয়েছে, মৌলিক পদার্থের সংখ্যা
বেড়েছে। তত দিনে যেহেতু মানুষ বুঝে গিয়েছে, মৌলিক পদার্থই
সব পদার্থ তৈরির মূল। তাই বিজ্ঞানীরা চিন্তা করেছেন, মৌলিক
পদার্থগুলোকে বুঝতে পারলেই মহাবিশ্বের সব কিছু বুঝা সম্ভবপর হবে। এ ধারণার
বশবর্তী হয়ে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করেছেন, মৌলিক পদার্থগুলোকে একসঙ্গে করে একটা তালিকা করে কোনো একটা ছাঁচে
ফেলতে। আর এই প্রচেষ্টায় সফলতা আসে ১৮৬৯ সালে রাশিয়ার তবোলস্ক শহরে জন্মগ্রহণকারী
আধুনিক পর্যায় সারণীর জনক দিমিত্রি মেন্ডেলিভের ৬৩ মৌলের তালিকা তৈরির মধ্য দিয়ে। প্রতিটা মৌলের
একটা নির্দিষ্ট পারমাণবিক ভর আছে-এই ধারণার বশবর্তী হয়ে মেন্ডেলিভ তাঁর তালিকা
সাজিয়েছিলেন পারমাণবিক ভরের ওপর ভিত্তি করে।
পারমাণবিক ভর ধরে সাজাতে গিয়ে মেন্ডেলিভ
কতগুলো সারি-কলামে ভাগ করে সারিগুলোকে পিরিয়ড আর কলামগুলোকে গ্রুপ নামে অভিহিত
করেন যাতে ছিল অজানা কিছু মৌলের ভবিষ্যদ্বাণী । তাঁর
সারণিতে ফাঁকা রাখা জায়গায় যখন মৌলে খুঁজে পাওয়া যায়, তখন
বিশ্বাস জন্মে, কিছু একটা নিশ্চয় আছে এই পর্যায় সারণির
পেছনে। তখন মানুষ ভেবেছিল পারমাণবিক ভরই এই কারণ।
এত দিন পরমাণুকে ধরা হয়েছিল অ্যাটম অর্থাৎ অবিভাজ্য অণু। অবিভাজ্য অণুতে ১৮৯৭ সালে ইলেকট্রনের উপস্থিতি টের পান জে. জে. থমসন । বিষয়টি বিংশ শতাব্দীর শুরুতে রাদারফোর্ডের স্বর্ণপাত আর আলফা কণার পরীক্ষায় আরও নিশ্চিত করে দেয় যে, পরমাণু কোনো অবিভাজ্য জিনিস না। পরমাণুরও একটা গঠন আছে। তারপর শুরু হয় নতুন ও অত্যাধুনিক রসায়নের এক যুগ। এর হাত ধরেই পদার্থবিজ্ঞানে আসে নতুন তত্ত্ব। কোয়ান্টাম তত্ত্ব, যা পদার্থবিজ্ঞানের আরও কিছু সমস্যার সমাধানে বেশ কার্যকর ভূমিকা দেখায়। বিজ্ঞানী নিলস বোর, সামারফেল্ডরা আরেকটু এগিয়ে নেন পরমাণুর গঠনকে। আর পরমাণুর গঠন বুঝতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেন, ইলেকট্রন পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চারপাশে কীভাবে স্তরে স্তরে অবস্থান করে। ওই স্তরগুলো মেলাতে গিয়ে দেখা যায়, পর্যায় সারণিতে এক গ্রুপের মৌলগুলো যে প্রায় একই ধর্ম দেখায় তার মূলে আছে ওই পরমাণুর চারপাশে থাকা ইলেকট্রন বিন্যাস।
উল্লেখ্য,
একটা পরমাণুতে থাকে যথাক্রমে ১. ইলেকট্রন, ২. প্রোটন আর ৩. নিউট্রন।
প্রোটন আর নিউট্রন থাকে পরমাণুর মাঝে, যাকে বলে
নিউক্লিয়াস। ইলেকট্রনগুলো থাকে বাইরে, চারপাশে কতগুলো
কোয়ান্টাম অরবিটালে। একটা পরমাণুর নিউক্লিয়াসে কতগুলো প্রোটন আছে তা-ই ঠিক করে দেয়
ওইটা কিসের পরমাণু। যেমন ১১টা প্রোটন থাকলে সেটা সোডিয়াম, ১২টা প্রোটন থাকলে ম্যাগনেসিয়াম। তেমনিভাবে ১১৮টা প্রোটন থাকলে
অগানেসন।
প্রোটনের
সঙ্গে নিউক্লিয়াসে থাকে নিউট্রন। নিউট্রনসংখ্যা সাধারণত প্রোটনের কাছাকাছি হয়। যেমন
কার্বনে সাধারণভাবে নিউট্রন থাকে ৬টা। কিন্তু ৮টা নিউট্রন থাকা এমন কোনো বিরল ঘটনা
না। নিউট্রন দুটি বেশি থাকলে পরমাণুর ভর একটু বেশি হয়। কিন্তু রাসায়নিক ধর্মে কোনো
পার্থক্য হয় না।
এরপর আসে
ইলেকট্রন। একটা সাধারণ পরমাণুতে যতগুলো প্রোটন থাকে, ইলেকট্রনও থাকে ঠিক
ততটা। ইলেকট্রন যেহেতু নিউক্লিয়াসের বাইরে থাকে, মাঝেমধ্যে
একটা–দুইটা ছুটে যেতে পারে বা একটা–দুইটা বাড়তিও হতে পারে। এই অবস্থাই হলো আয়নিত অবস্থা বা চার্জিত
অবস্থা।
একটা
পরমাণুর সবচেয়ে মৌলিক ব্যাপার পারমাণবিক সংখ্যা বা প্রোটন সংখ্যা। তবে পর্যায় সারণির
জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো পরমাণুর তালিকা এক-দুই-তিন করে পারমাণবিক সংখ্যা হিসেবে না
সাজিয়ে সারণি ভর অনুসারে মৌলগুলোর ধর্ম ধরে সারি কলামে ভাগ করা যা করে মেন্ডেলভ
জগদ্বিখ্যাত হয়ে আছেন আজও । তবে তা পারমাণবিক সংখ্যা ও ধর্মের সামঞ্জস্য বিষয়ে
ভালো ব্যাখ্যা ছিল না। অবশ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায় শেষমেশ ইলেকট্রন বিন্যাসে। যতই কোয়ান্টাম
মেকানিকসের উন্নতি ঘটেছে, বিজ্ঞানীরা ইলেকট্রন বিন্যাস তত ভালো
বুঝেছেন। পর্যায় সারণির তালিকার রহস্য ততই উন্মোচিত হয়েছে।
১৮৭১ সালে মেন্ডেলিভ আরও পরিমার্জিত যে পর্যায় সারণিটি দিয়েছিলেন সেখানে সবচেয়ে ভারী মৌল ছিল ইউরেনিয়াম যার প্রোটনসংখ্যা ৯২। অথচ মাঝের অনেকগুলো প্রোটনসংখ্যার মৌল নেই। তাহলে সেগুলো কোথায়? ওগুলোই পরবর্তী সময়ে খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়েছে। খুঁজতে গিয়ে প্রকৃতিতে অনেকগুলোই পাওয়া গেছে। কিন্তু পাওয়া যায়নি টেকনিশিয়াম। ৪৩ পারমাণবিক সংখ্যার এই মৌলের অর্ধায়ু খুব কম। তাই শত কোটি বছরের পৃথিবীতে পৃথিবী গঠনের সময় উৎপন্ন হয়ে থাকলেও এত দিনে সবটাই ভেঙে অন্য কোনো পদার্থ হয়ে গেছে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ করে। শেষমেশ ১৯৩৭ সালে ল্যাবে বানানো গিয়েছে টেকনিশিয়াম মৌল।
ল্যাবে
টেকনিশিয়াম বানানোর পর বিজ্ঞানীরা অন্য না পাওয়া মৌলগুলো খুঁজেছেন গবেষণাগারে। প্রকৃতিতে
অনেকগুলো মৌলই পাওয়া যায়। টেকনিশিয়াম বাদে ৯২ পর্যন্ত বেশ আছে। খুব অল্প পরিমাণে
৯৩ ও ৯৪-ও পাওয়া যায়। প্রকৃতিতে কোথাও পাওয়া যায় না এমন ২৪টি মৌল ল্যাবরেটরিতে
বানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
পর্যায়
সারণি যদি দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে এখন সর্বশেষ মৌলের
পারমাণবিক সংখ্যা ১১৮। নাম, অগানেসন। এই ১১৮টা মৌলই মানুষ
কোনো না কোনো সময় পর্যবেক্ষণ করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, ল্যাবরেটরিতে
১১৯ বা পরের মৌলগুলো বানানো যাবে?
পর্যায়
সারণিতে পর্যায় বা সারি আছে ৭টা। ১১৮ নম্বর মৌল আবিষ্কারের পর ৭টা পর্যায়ই পূর্ণ
হয়ে গেছে। এর পরের মৌল, মানে ১১৯ বা পরের কোনো মৌল আবিষ্কার হলে
তার অবস্থান হবে অষ্টম পর্যায়ে। মজার ব্যাপার হলো, শুরু
থেকেই বর্তমান রূপের পর্যায় সারণির পর্যায় ছিল ৭টা। তাই অষ্টম পর্যায় একটা বড়
ঘটনাই হবে পর্যায় সারণির জন্য। যদি ইলেকট্রন বিন্যাস দেখা হয়, তাহলে দেখা যাবে, ১১৯ নম্বর মৌল পাওয়া সহজ কথা নয়। নতুন পর্যায় শুরু করাও কঠিন হবে।
তারপরও
সহজ একটি রেসিপি কিন্তু আছে ১১৯ নম্বর মৌল বানানোর। এ জন্য প্রথমে লাগবে
বার্কেলিয়াম। বার্কেলিয়ামের পারমাণবিক সংখ্যা ৯৭। নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ায় উৎপন্ন হয়, খুবই
তেজস্ক্রিয় মৌল। কয়েক মিলিগ্রাম বার্কেলিয়াম নিয়ে তার ওপর আলোর বেগের এক–দশমাংশ বেগে টাইটেনিয়াম আয়ন ছুড়তে হবে। এভাবে যদি টানা এক বছর
টাইটেনিয়াম আয়ন ছোড়া হয়, ১০১৮ টা টাইটেনিয়াম আয়নের আঘাতে
একটা ১১৯ পারমাণবিক সংখ্যার পরমাণু উৎপন্ন হতে পারে। এই উৎপাদন বছরের যেকোনো
মুহূর্তে হবে, তাই পুরো বছরই নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে,
কারণ এটা বলা কঠিন যে ১১৯ মৌল কতক্ষণ স্থায়ী হবে। আগের মৌলগুলোর
অভিজ্ঞতা বলে মিলি সেকেন্ডের ভগ্নাংশ স্থায়ী হবে, তারপর
একটা আলফা আর একটা গামা কণা উৎপন্ন করবে, যা গিয়ে আঘাত
করবে চারপাশে রাখা সিলিকন ডিটেক্টরে, তাতে ধরা পড়তে পারে
পৃথিবীর প্রথম ১১৯ নম্বর মৌল। শুধু পৃথিবীর নয়, সম্ভবত
মহাবিশ্বেরই প্রথম হবে, যদি না কোনো এলিয়েন আগেই বানিয়ে
থাকে।
বোঝাই
যাচ্ছে,
১১৯-কে খুঁজে পাওয়া সহজ কোনো কাজ হবে না। জার্মানির বিজ্ঞানীরা
২০১২ সালে কয়েক মাস এই পদ্ধতিতে চেষ্টা করেছেন। রাশিয়া আর জাপানের বিজ্ঞানীরাও
চেষ্টা করেছেন ১২০-কে খুঁজতে। এখন পর্যন্ত কেউ পারেননি ১১৯ বা ১২০ উৎপাদন করতে।
যাঁরা
কৃত্রিম মৌল নিয়ে কাজ করতেন, তাঁরা এখন তাঁদের টার্গেট পরিবর্তন
করছেন কিছুটা। নতুন মৌল না খুঁজে তাঁরা চেষ্টা করছেন ইতিমধ্যে বানানো মৌলগুলোর
ধর্ম সম্পর্কে কিছু জানা যায় কি না। তাই কৃত্রিম মৌল আবিষ্কারক করা বেশ কয়েকটি
ল্যাবরেটরীই নতুন মৌল খোঁজা বন্ধ করে দিয়েছে ইউরি অগানেসিয়ানের (যাঁর নামে ১১৮তম
মৌলের নামকরণ), নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাশিয়ার জয়েন্ট
ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ। অগানেসিয়ান জানিয়েছেন, নতুন একটা মৌল খুঁজে পাওয়া কঠিন বলে তাঁরা এখন আরও ভারী একটা পরমাণু
বানানোর চেয়ে এর মধ্যে আবিষ্কৃত পরমাণুগুলোর ধর্ম নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর ভাষায়,
‘আরও ভারী একটা মৌল খুঁজে পাওয়াকে আমি অসম্ভব বলছি না, কিন্তু বর্তমানে আমি এর কোনো উপায় জানি না।’
পর্যায়
সারণিতে একটা মৌল কোনো একটা গ্রুপে আছে, মানে সে ওই গ্রুপের অন্য
মৌলগুলোর সঙ্গে ধর্মে একটা সামঞ্জস্য রাখে। কিন্তু অতি ভারী পরমাণুগুলো, মোটামুটি ১০০-এর বেশি পারমাণবিক সংখ্যার মৌলগুলো আসলেই এই ধর্মের
সাদৃশ্যতা দেখাবে কি না, নিশ্চিত করে এখনো বিজ্ঞানীরা
জানেন না। যেমন ১১৮তম মৌলটি (অগানেসন) আছে নিষ্ক্রিয় গ্যাসের সঙ্গে একই গ্রুপে।
নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো এরা সহজে অন্য মৌলের সঙ্গে বিক্রিয়া
করে না। সাধারণ অবস্থায় এরা গ্যাস। এখন অগানেসনও কি গ্যাসই হবে? এই মৌলও কি অন্য মৌলের সঙ্গে সহজে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় যাবে না? গত বছর প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রের হিসাব অনুযায়ী, অগানেসন অন্য নিষ্ক্রিয় গ্যাসের মতো হওয়ার কথা নয়।
তাই
প্রশ্ন উঠেছে, কোনো একটা মৌলের পর থেকে পর্যায় সারণির যে ধর্মের
সাদৃশ্যতার বৈশিষ্ট্য, তা কি শেষ হয়ে যাবে? রসায়নবিদদের একদলের মত হলো, একটা সময় গিয়ে
ধর্মের সাদৃশ্যতা শেষ হয়েই যাবে। কারণ ইলেকট্রন সংখ্যা যখন অনেক বেড়ে যাচ্ছে,
অরবিটালে ইলেকট্রনের শক্তির পার্থক্য অনেক কমে যাবে। তাই অনেক
ভারী মৌলের রাসায়নিক ধর্মে সাদৃশ্যতা আগের মতো বজায় থাকবে না।
আপেক্ষিকতা–সংক্রান্ত
সমস্যারও উদ্ভব হতে পারে। খুব ভারী মৌলে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব কাজ করবে ইলেকট্রনের
গতি অনেক বেশি হওয়ায়। তাই দেখা যাবে ধর্মে আরও বেশি পার্থক্য হচ্ছে।
আরেকটা
সমস্যা হলো, একটা মৌলের স্থায়িত্ব। এখন একটা মৌলকে স্বীকৃতি পেতে
বানানোর পরে মাত্র ১০-১৪ সেকেন্ড থাকলেই হয়। কিন্তু এত অল্প সময়ে ওই মৌলের ধর্ম
সম্পর্কে খুব সামান্যই ধারণা পাওয়া যায়। ১০০-এর বেশি পারমাণবিক সংখ্যার মৌলগুলোর
বেশির ভাগই চোখের পলকে বিকিরণ করে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বিজ্ঞানীদের একটা আশা,
হয়তো এমন কোনো আইসোটোপ বানানো যাবে, এমন
কোনো পদ্ধতি পাওয়া যাবে, যাতে ল্যাবে বানানো মৌলের
স্থায়িত্ব একটু বাড়ানো যায়। এ জন্য চলছে আরেকাংশের গবেষণা।
সাধারণভাবে
প্রোটন নিউট্রনের অনুপাতের একটা ভূমিকা আছে পরমাণুর স্থায়িত্বে। ফ্লেরোভিয়াম-২৯৮, যার
প্রোটন ১১৪ ও নিউট্রন ১৮৪টা, ধারণা করা হয়, এই আইসোটোপ কিছুটা স্থায়ী হবে। আসলেই স্থায়ী হবে কি না, হলে অন্য পরমাণুগুলোর জন্যও এমন স্থায়ী আইসোটোপ বানানো যায় কি না,
তা নিয়েই এই দলের বিজ্ঞানীদের গবেষণা।
সব
মিলিয়ে রসায়নবিদেরা সবাই একমত যে পর্যায় সারণিতে একসময় ‘শেষ’
আসবে। তারপর নতুন কোনো মৌল পাওয়া যাবে না। এর পেছনে যুক্তি হলো,
অনেক বেশি ইলেকট্রন যখন একটা নিউক্লিয়াসের চারপাশে থাকবে,
একটা সময় দেখা যাবে, ইলেকট্রনগুলো আর ওই
নিউক্লিয়াসের আকর্ষণে বাধা থাকছে না। তখন আসলে ওই মৌলের আর অস্তিত্বই থাকবে না।
এ
ব্যাপারে রিচার্ড ফাইনম্যানের হিসাব হলো, ১৩৭ নম্বর মৌল হলো সেই মৌল,
যার পরে আর নিরপেক্ষ মৌল সম্ভব না ইলেকট্রনের সংখ্যাধিক্যের
কারণে। তাঁর হিসাব, এই মৌলের পরে আর মৌল যোগ হবে না
পর্যায় সারণিতে। তাঁর হিসাব ছিল রিলেটিভিস্টিক ডিরাক সমীকরণ ব্যবহার করে। কিন্তু
পরে কোয়ান্টাম ইলেকট্রডাইনামিকস ব্যবহার করে দেখা গেছে, এই
সংখ্যাটা হবে ১৭৩। এই হিসাব আরও বেশি নিখুঁত। অনেকের ধারণা, ১৩৭ নম্বর পরমাণুই হলো পর্যায় সারণির সর্বোচ্চ সীমা।
তবে সব হিসাব বলে, ১১৯ আর ১২০ নম্বর মৌল পাওয়া সম্ভব। তাই এখন সবার অপেক্ষা পর্যায় সারণির ওই দুই সদস্যকে খুঁজে পেতেই।মেন্ডেলিভ ১৮৬৯ সালে প্রথম পর্যায় সারণি প্রকাশ করার পর থেকে প্রতি দুই থেকে তিন বছরে গড়ে একটা করে মৌল যোগ হয়েছে পর্যায় সারণিতে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, একটা স্থবিরতা এসেছে নতুন মৌল খুঁজে পেতে। শেষ নতুন মৌল শনাক্ত হয়েছিল ২০১০ সালে, নাম টেনেসাইন, পারমাণবিক সংখ্যা ১১৭। ১১৯ বা ১২০ হয়তো পাওয়া যাবে। অনেক ধৈর্যশীল, আধুনিক কোনো গবেষণাগারে। কিন্তু এর পরের মৌল, অর্থাৎ ১২১ বা আরও বেশি পারমাণবিক সংখ্যার মৌল আমাদের বর্তমান জানা প্রযুক্তিতে পাওয়া সম্ভব না বলেই মনে করছেন বেশির ভাগ বিজ্ঞানী। এ জন্য দরকার হবে নতুন ধরনের কোনো প্রযুক্তি। (সূত্র: বিজ্ঞান চিন্তা, নেচার, আইইউপিএসি, উইকিপিডিয়া)।
বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব [Special Theory of Relativity (STR)]
আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা বা আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব [Special Theory of
Relativity (সংক্ষেপে STR)] হলো স্থান ও কাল এর আন্তঃসম্পর্ক বিষয়ক সাধারণভাবে গৃহীত ও
পরীক্ষা-পর্যবেক্ষন দ্বারা দৃঢ়ভাবে সমর্থিত তত্ত্ব। এই তত্ত্বটি জার্মান
পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন প্রথম ১৯০৫ সালে On the
Electrodynamics of Moving Bodies নামক গবেষণা পত্রে প্রকাশ
করেন। এই বিশেষ আপেক্ষিকতাকে সাধারণ আপেক্ষিকতার একটি বিশেষ রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয় ।
সাধারণ
আপেক্ষিকতা তত্ত্ব
১৯০৭ থেকে
১৯১৫ সালের মধ্যে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন কর্তৃক
প্রবর্তিত সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বমতে, দুই বা
ততোধিক ভরের মধ্যে পর্যবেক্ষণকৃত মহাকর্ষের কারণ হল, তারা
নিজেদের ভরের মাধ্যমে আশে-পাশের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেয়। ব্যাপারটি অনেকটা টানটান করে
বেঁধে রাখা একটি চাদরের মাঝখানে একটি বেশ ভারী পাথর চাপিয়ে দেয়ার মত। পাথর রাখার
কারণে চাদরের কেন্দ্রভাগে একটি বক্রতার সৃষ্টি হয়। ফলে এখন চাদরের উপর অপেক্ষাকৃত
কম ভরের আরেকটি পাথর রাখা হলে পাথরটি কেন্দ্রের দিকে ঝুঁকে পড়বে বা পড়ে যেতে
চাইবে। এতে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, বেশি ভরের পাথরের মাধ্যমে
সৃষ্ট বক্রতার কারণে কম ভরের পাথরটি তার দিকে টান অনুভব করছে। মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে
এই চাদরটিই হল স্থান-কালের জালিকা।
মহাকর্ষের
মাধ্যমে আলোর বেঁকে যাওয়ার কারণে মহাকাশে যে অভাবনীয় ঘটনা পরিদৃষ্ট হয় তাকে মহাকর্ষীয় লেন্সিং বলা হয় যা
জ্যোতির্বিজ্ঞানে গুরুত্বের সাথে পঠিত হয়।
উল্লেখ্য, লিগো এবং জিও ৬০০ প্রকল্পের
অনেক বিজ্ঞানীই সাধারণ আপেক্ষিকতায় মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সরাসরি
প্রমাণ পেয়েছেন। কৃষ্ণ বিবর (Black Hole) থেকে
নির্গত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ অধ্যয়নের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আদি মহাবিশ্বের গঠন বিষয়ে
সম্যক ধারণা অর্জন করতে পারেন। এছাড়া সাধারণ আপেক্ষিকতা ভৌত বিশ্বতত্ত্বের মহা বিস্ফোরণ তত্ত্বের মৌলিক
ভিত্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
১৯০৫ সালে বিশেষ আপেক্ষিকতা বা আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব প্রকাশের পর মহাকর্ষ-কে কীভাবে নতুন উদ্ভাবিত আপেক্ষিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত
করা যেতে পারে-সে সম্পর্কে আইনস্টাইন ১৯০৭ সাল হতে চিন্তা-ভাবনা ( গবেষণা) শুরু করেছিলেন। গবেষণার শুরুর দিকে এ বিষয়ে
তিনি ইতস্তত: বিক্ষিপ্ত যে সব তাত্ত্বিক চিন্তা-ভাবনা
করেছিলেন তার কিছু বিষয় ১৯১৫ সালের নভেম্বরে বিশেষ বিবেচনায় প্রুশিয়ান একাডেমি অফ সায়েন্স কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করে-যা বর্তমানে আইনস্টাইনের
ক্ষেত্র সমীকরণ হিসাবে পরিচিত। এটি আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের মূল রূপ। মূলত: এই সমীকরণ মতে, স্থান এবং সময়ের জ্যামিতি যে কোনও পদার্থ এবং
বিকিরণের উপস্থিতি দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়। ১৯১৩
সালে গ্রোসম্যান এবং আইনস্টাইন যৌভাবে জ্যামিতিক
ধারণাটি প্রকাশ করেছিলেন। জ্যামিতিক ধারণাগুলো মূল
জ্যামিতিক কাঠামোর মাধ্যমে আইনস্টাইনকে সাধারণ আপেক্ষিকতা তৈরি করতে সাহায্য
করেছিল। এই ধারণাটি গণিতবিদ মার্সেল গ্রোসমান দ্বারা নির্দেশিত হয়েছিল। তবে ১৯১৬ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল শোয়ার্জচাইল্ড আইনস্টাইন ক্ষেত্র সমীকরণের প্রথম অ-তুচ্ছ সঠিক সমাধান
খুঁজে পেয়েছিলেন। যেটি শোয়ার্জচাইল্ড মেট্রিক নামে পরিচিতি পায়।
উল্লেখ্য, জগৎ সম্পর্কিত দ্বি-মাত্রিক বিভিন্ন
আকারের ক্ষেত্রফল ও পরিসীমা এবং
ত্রিমাত্রিক বস্তুসমূহের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল ও আয়তন নির্ণয়ক
বিজ্ঞানকে জ্যামিতি বলা হয়। উনিশ শতকের খ্যাতনামা গণিতবিদ বার্নহার্ড
রিমানের উদ্ভাবিত ইউক্যালিডিয়ান জ্যামিতিকে রিমানিয়ান জ্যামিতি
বলা হয়।
সূর্যগ্রহণ
কী (Solar Eclipse)
পৃথিবী, চন্দ্র ও সূর্য যখন একই সরলরেখায় অবস্থান করে এবং
চন্দ্র, পৃথিবী ও সূর্যের মাঝে এসে ছায়ার সৃষ্টি করে তখন সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছায় না। এই মহাজাগতিক ঘটনাকেই সূর্যগ্রহণ বলে।
চন্দ্রগ্রহণ : পৃথিবী যখন
চাঁদ ও সূর্যের মাঝখানে এসে পড়ে কিছু সময়ের জন্য তখন পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্য একই সরল রেখায়
অবস্থান করতে থাকে। ফলে পৃথিবী পৃষ্ঠের মানুষ/প্রাণীদের
থেকে চাঁদ কিছু সময়ের জন্য অদৃশ্য হয়ে যায়। এটাকে চন্দ্রগ্রহণ বলে। ইংরেজীতে Lunar
eclipse বলে।
জোয়ার-ভাটা কি?
চন্দ্র ও
সূর্যের আকর্ষণ এর ফলে সমুদ্রের এক প্রান্তের পানি যখন স্ফিত বা ফুলে ওঠে এবং অন্য
জায়গার পানি স্বাভাবিকভাবে নেমে যায়।চন্দ্র সূর্যের অআকর্ষণে সাগরে বাড়তি পানির
উদ্ভব হয় না। যেমন গ্রীষ্মে দিন বড় হয় রাত ছোট হওয়ার কারণে, আবার শীতে রাত বড় হয় দিন ছোট
হওয়ার কারণে। যে স্থানের পানি বৃদ্ধি পায় তাকে জোয়ার বলে। যে স্থানের পানি কমে
যায় তাকে ভাটা বলে।
মহাবিস্ফোরণ (Big Bang)ঘটার
পূর্বেকার অবস্থাঃ
Computer simulationএর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, সর্ম্পূণ নাই/শুন্য/নিল (Nil)/জিরো(Zero) থেকে মহাবিশ্বের মহাসৃষ্টির সূচনার পূর্বে র্অথাৎ মহাবিস্ফোরণ(Big Bang) ঘটার পূর্বে
মহাশক্তিশালী এক প্রকার আলোক শক্তিই বিদ্যমান ছিল-যার বৈজ্ঞানিক নামঃ “মহাসূক্ষ্ণ আলোক বিন্দু” (Highest Energetic Radiation)। এতেই সম্মিলিতভাবে(Combined) নিহিত ছিল আজকের আসমান
ও যমিন বা পৃথিবী। বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় ১৫০০ কোটি থেকে ২০০০ কোটি বৎসর পূর্বে উক্ত “মহাসূক্ষ্ণ” বিন্দুটি 10º³e.s.aপর্যায়ে স্থিতি লাভ করেছিল। ১৯৬৫ সালে পশ্চাৎপদ বিকিরণ (Back Ground Radiation)আবিস্কারের ফলে বিজ্ঞান এ সত্য মানব জাতিকে
অবগত করাতে সক্ষম হয় যে, শুণ্য
থেকে সৃষ্ট উক্ত Highest Energetic Radiation নামক মহাআলোক গোলকটি মহাবিস্ফোরণ (Big Bang)এর পূর্বে (১) আলো (২) শক্তি ও
(৩) তাপ-এই ত্রিমাত্রিক অবস্থায় বিরাজমান ছিল । এই সময় তাপমাত্রার পরিমাণ ছিল 10³²ডিগ্রি কেলভিন অর্থাৎ ১০,০০০ কোটি, কোটি, কোটি, কোটি ডিগ্রি কেলভিন।
মহাবিস্ফোরণ (big
bang)ঘটার পরবর্তী মুহুর্তের অবস্থা
বৈজ্ঞানিক ভাষ্যমতে Highest Energetic Radiation-এ মহাবিস্ফোরণ (big bang) ঘটার পর মুহুর্তে তাপমাত্রা 10³ºkথেকে দ্রুত 10²8-এ নেমে আসে তখন (highest energetic photon)কণিকারা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটিয়ে পদার্থ
কণিকা হিসেবে প্রথম বারের মত ‘কোয়ার্ক’ এবং এন্টি কোয়ার্ক এর জন্ম দেয়। অতঃপর তাপমাত্রা যখন আরো নিচে নেমে 10¹³kকেলভিনে দাঁড়ায় তখন কোয়ার্ক
এবং এন্টি কোয়ার্কের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। এতে উভয় এর ব্যাপক ধ্বংস সাধন ঘটে এবং
অবশিষ্ট থেকে যায় কিছু কোয়ার্ক। এরপর যখন তাপমাত্রা আরো কমে
গিয়ে 10¹ºkকেলভিন-এ দাঁড়ায় তখন ৩টি
কোয়ার্ক (১টি আপ কোয়ার্ক এবং ২টি ডাউন কোয়ার্ক মিলিত হয়ে প্রোটন কণিকা (Proton Particle)এবং ৩টি কোয়ার্ক (২টি আপ কোয়ার্ক এবং ১টি ডাউন কোয়ার্ক) মিলিত হয়ে নিউট্রন
কণিকা (Neutron Particle) সৃষ্টি হতে থাকে। তারপর তাপমাত্রা যখন 10000000000কেলভিন-এ নেমে আসে তখন পরিবেশ
আরো অনুকুলে আসায় সৃষ্ট প্রোটন কণিকা ও নিউট্রন কণিকা পরষ্পর মিলিত হয়ে প্রথমবারের
মত মহাবিশ্বে এটমিক নিউক্লি গঠিত হতে থাকে। এরপর তাপমাত্রা আরও কমে গিয়ে 1000000000 কেলভিন তখন এটমিক নিউক্লি মহাবিশ্বে বিক্ষিপ্ত ভাবে ছুটে চলা ইলেকট্রনিক
কণিকাকে (Electronic Particle)চর্তুদিকের
কক্ষপথে ধারণ করে। ফলে প্রথমবারের মত অণু'র (atoms)সৃষ্টি হয়। আরও পরে যখন তাপমাত্রা ৩,০০০ কেলভিনে উপনীত হয় তখন
মহাবিশ্বের মূল সংগঠন গ্যালাক্সি (Galaxy) সৃষ্টি
হতে থাকে। পরবর্তীতে এর ভেতর নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ ইত্যাদি সৃষ্টি হতে থাকে। অতঃপর তাপমাত্রা যখন আরো নিম্নগামী হয়ে
মাত্র ৩ কেলভিনে নেমে আসে তখন সার্বিক পরিবেশ অনুকূলে থাকায় পৃথিবীতে গাছ-পালা, জীব-জন্তু ও প্রাণের ব্যাপক সমাবেশ সমাগম ঘটতে থাকে-এই হচ্ছে ২০১২ সালের ৪ঠা জুলাইয়ের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের আধুনিক বৈজ্ঞানিক
সৃষ্টিতত্ত্বের ইতিকথা।
সৃষ্টি তত্ত্ব বিষয়ক STANDARD MODEL
পদার্থ বিদ্যার যে তত্ত্বটির
সাহায্যে কোন বস্তুর ভরের ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয় তাকে “ষ্ট্যান্ডার্ড মডেল” (Standard
Model)বলা হয়। এই ষ্ট্যান্ডার্ড মডেলটি
অস্তিত্বশীল হতে হলে প্রয়োজন পড়ে এমন এক অতি পারমাণবিক কণা- যার বৈজ্ঞানিক নাম “হিগস-বোসন কণা” বা God’s
particle। পদার্থ বিদ্যার এই
ষ্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুসারে, মহাবিশ্বের
প্রতিটি বস্তুর ভর সৃষ্টির প্রাথমিক ভিত্তি হচ্ছে একটি “অদৃশ্য
কণা”। বস্তুর ভরের মধ্যে ভিন্নতার
কারণও এই অদৃশ্য কণাটিই। পদার্থের ভর কিভাবে তৈরি হয় তা
জানতে ১৯৬৪ সাল থেকে শুরু হয়
গবেষণা। ২০০১ সালে এসে গবেষকরা যুক্তরাষ্ট্রের ফার্মিল্যাবের "টেভাট্টন"
নামক যন্ত্ররে মাধ্যমে ওই কণার খোঁজ করতে শুরু করেন। এ কণার খোঁজে ২০০৮ সালে
প্রতিযোগিতায় নামেন CERNএর খ্যাতনামা গবেষকরা। ২০১১
সালে CERNএর বিজ্ঞানীরা এ কণার প্রাথমিক অস্তিত্ব টের
পান।
বস্তু/পদার্থ এলো কি করে?
বৈজ্ঞানিক গবেষণামতে, মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং পরবর্তী সদ্য সৃষ্ট মহাবিশ্ব
যখন একটু শীতল হলো, তখন সেখানে সৃষ্টি হয় অদৃশ্য এক
ধরণের বল -যাকে বলা হয় হিগস ফিল্ড (Higgs Field)|হিগস ফিল্ডে তৈরী হয় অসংখ্য
ক্ষুদে কণা। এই হিগস ফিল্ড দিয়ে ছুটে যাওয়া সব কণা হিগস-বোসনের সংস্পর্শে এসে
ভরপ্রাপ্ত হয়। ভরপ্রাপ্ত এই কণা-কে বলা হয়
বস্তু বা পদার্থ (Matter)।
হিগস বোসন কণা কী ?
A subatomic particle called the Higgs
Boson Particle or “God’s particle”.
অর্থঃ অতি পারমানবিক কণাকে হিগস-বোসন কণা বলা হয়।
বিগ ব্যাং বা মহাবিষ্ফোরণ
পরবর্তী অবস্থায় কি কি সৃষ্টি হতে পারে তা আলবার্ট আইনেস্টাইন দিব্যি উপলদ্ধি
করতেন। এ উপলদ্ধিতেই নিহিত ছিল আজকের সাড়া জাগানো “হিগস বোসন” নামক
আবিস্কৃতঅতিপারমানবিক কণাটি।
হিগস-বোসন কণার তাত্ত্বিক ধারক
“বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট” তত্ত্বের
ইতিকথা
সত্যেন্দ্রনাথ বসু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ
স্যার জগদিশ চন্দ্র বসু যেমন
বেতার যন্ত্র আবিস্কারের স্থপতি, তেমন
হিগস বোসন বা অতিপারমানবিক কণার অস্তিত্বের ধারণার ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এর পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন অন্যতম
পথিকৃত এবং অপর জন হচ্ছেন জার্মান পদার্থ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনেস্টাইন। উভয়ের যৌথ
গবেষণার ফলাফল-কে বলা হয় “বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট”-যার উপর ভিত্তিশীল আজকের হিগস-বোসন বা গড'স
পার্টিকেল। উল্লেখ্য, পদার্থ বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ
বসু নামের শেষাংশ ‘বসু’ এরপরিবর্তিত
নামটি হচ্ছে ‘বোসন’। বস্তুতঃ বোস-আইনস্টাইন ছিলেন হিগস বোসন কণার তাত্ত্বিক স্থপতি- যার প্রাতিষ্ঠানিক রূপকার হচ্ছেন আরেক পদার্থ বিজ্ঞানী
অধ্যাপক পিটার হিগস। এ কারণে আবিস্কৃত অতিপারমানবিক কণার “হিগস” নামকরণ এবং নোবেল পুরস্কারের অধিকারী হন
মিঃ হিগস।
হিগস-বোসন কণা আবিস্কারের ইতিকথাঃ
“হিগস্-বোসন” নামক কণাটি বিজ্ঞানীদের কাছে একটি “হাই-পোসেটিক্যাল” কণিকা হিসেবে বিবেচিত ছিল। পদার্থ
বিজ্ঞানের বিশেষ থিওরী standard model থেকে
বিজ্ঞানীরা এ কণা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পান। সাধারণতঃ হিগস-বোসনের ভর ১২৫ থেকে ১২৬
এবং এ কণিকার স্পিন হচ্ছে শূণ্য। হিগস-বোসন কণাকে বলা হয় সুপার সিমেট্রিক (super
cemetery)) পদার্থ যা-সৃষ্টির শুরুর সময়কার প্রাথমিক কণিকা
বিবেচিত।
অধ্যাপক
পিটার হিগস কর্তৃক বস্তুর ভরের উৎস সর্ম্পকে হিগস-বোসন কণার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
হিগস-বোসনের অচিন্ত্যনীয়
গুরুত্ব, ভূমিকা ও অবদান এবং
এর সন্ধানে বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টা অংশ হিসাবে ১৯৬৪ সালে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের
অধ্যাপক পিটার হিগস বস্তু/পর্দাথরে ভরের উৎস হিসেবে হিগস-বোসনের বৈজ্ঞানিক
ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি বলেন, আমরা একটা আঠালো
ব্যাক গ্রাউন্ড ক্ষেত্রের কথা ভাবতে পারি। কণাগুলো এর মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময়
ভরপ্রাপ্ত হয়। অবশ্য এর পিছনে প্রভাবক হিসেবে
কাজ করে একটি অনুঘটক।
যে প্রক্রিয়ায় হিগস-বোসন কণার অস্তিত্ব প্রমাণিত হলো
‘কণা’ (PARTICLE) সম্পর্কিত গাণিতিক
মডেলের (Mathematical Model) সূত্রমতে, উচ্চ গতিতে প্রোটনের সঙ্গে প্রোটনের
আন্তঃসংঘর্ষ ঘটানো হলে বেশ কিছু মৌলিক কণা উৎপন্ন হয়। সেমতে, CERNএর লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার যন্ত্রে উচ্চ গতিতে প্রোটনের সঙ্গে প্রোটনের
আন্তঃসংঘর্ষ ঘটিয়ে বেশ কিছু মৌলিক কণা উৎপাদন করা হয়। উৎপাদিত এই মৌলিক কণা-কে বলা
হয় “হিগস্-বোসন” কণা।
হিগস-বোসন কণা'র অস্তিত্ব প্রমাণে CERNএর
বিপুল আয়োজন !
পদার্থবিদরা বিশ্বাস করেন যে, রহস্যময় হিগস-বোসনের সঙ্গে সংঘর্ষে বিভিন্ন মাত্রার ভরের (Mass) জন্ম হয়। পদার্থ বিজ্ঞানের এ সংক্রান্ত বেশ কিছু প্রশ্নকে সামনে রেখে ১৯৭১ সাল থেকে
কণাত্বরণ যন্ত্র লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারে এ বিষয়ে বাস্তব প্রমাণের উদ্যোগ নেয়া হয় । তবে ২০০৮ সাল থেকে এই
কলাইডারের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।বিপুল শক্তিসম্পন্ন অতি পারমাণবিক
কণার জন্ম-তত্ত্ব আবিস্কার করতে CERNআয়োজন করেছিল
বিশাল আকারের মহাপরিকল্পনা। এই পরীক্ষা মানব ইতিহাসে শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয়; দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয় বহুলও বটে। অতি পারমাণবিক কণার জন্ম-তত্ত্ব
গবেষণার প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল তৎকালীন প্রায় ৫০০ কোটি পাউন্ড এবং তাতে উপস্থাপিত
হয়েছে অন্ততঃ ৬০,০০০ (ষাট হাজার) অত্যাধুনিক কম্পিউটার ।
হিগস-বোসন কণার নির্ভুল অস্তিত্বপ্রমাণে CERN এর
সর্বোচ্চ সর্তকতা
বস্তু-পদার্থজাত বিশ্ব সৃষ্টির নির্ভুল ও অভিন্ন রহস্য বা উৎসমূল
আবিস্কারের মহৎ লক্ষ্যে আজিকার বিশ্বের খ্যাতনামা সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
গবেষণা কেন্দ্রে CERNকর্তৃক বিশ্বের খ্যাতনামা
বিজ্ঞানীদের-কে যথাক্রমে (১)Atoroidal lhc apparatus
(atlas) এবং (২) Compact muon solenoid
(cms) নামক দু'টি দলে বিভক্ত করা হয়। সর্ম্পূণ পৃথক ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায়
একদল-কে জেনেভা এবং অপর দল-কে লন্ডনে নিয়োজিত করা হয়েছিল-যাতে উভয় দল একে অপরের
কার্যক্রম সর্ম্পকে বিন্দুমাত্র
অবহতি না হতে পারে। উদ্দেশ্য: নির্ভুলভাবে অভিন্ন ফলাফল লাভ। অবশেষে উভয় দল বিশাল
দূরত্বে (জেনেভা হতে লন্ডন) অবস্থান করে কোন প্রকার পূর্ব যোগাযোগ ব্যতিরেকেই হিগস-বোসন অতিপারমানবিক কণা প্রাপ্তির বিষয়ে একই সঙ্গে
একই ফলাফলে উপনীত হয়। যার ফলে CERNকর্তৃপক্ষ ২০১২ সালের ৪ঠা জুলাই, বুধবার এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মলেনে বিশ্ববাসীকে এ মর্মে বিজ্ঞাপিত করে যে, স্ট্যান্ডার্ড মডেলের স্বীকৃত ১২তম “হিগস-বোসন
নামক বহুল প্রত্যাশিত মৌলিক কণারটির সন্ধান পাওয়া গেছে।
সের্ণ (CERN) পরিচিতি
অর্গানিজাসিওঁ ওরোপেএন পুর লা রেশের্শে ন্যুক্লেয়্যার
(ফরাসি: Organization européenne pour la
recherche nucléaire; ইংরেজি ভাষায়: European
Organization for Nuclear Research), যা সের্ন নামে বেশি
পরিচিত (উচ্চারণ [sɜːɹn] বা ফরাসি উচ্চারণে [sɛrn]), জেনেভা শহরের পশ্চিমে ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ড-এর
মধ্যকার সীমান্তে অবস্থিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ কণা পদার্থবিজ্ঞান (Particle
Physics) গবেষণাগার। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব এর পীঠস্থান
হিসাবেও এর পরিচিতি রয়েছে। ১৯৫৪ এর সেপ্টেম্বর ২৯-এ অনুষ্ঠিত এক সভায় সের্ন
প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি স্বাক্ষরিত হয়। প্রস্তাবে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রের সংখ্যা
শুরুতে মাত্র ১২ থাকলেও বর্তমানে এই সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যা বেড়ে ২০-এ
দাঁড়িয়েছে।
সের্ন-এর আদি নাম ফরাসি "কোঁসেই ওরোপেয়ঁ পুর লা
রেশের্শে ন্যুক্লেয়্যার" (Conseil Européen
pour la Recherche Nucléaire)-এর আদ্যক্ষর চতুষ্টয় c,
e, r, ও n থেকেই CERN বা সের্ন নামের উৎপত্তি।
সার্ণের প্রথম অনন্য
আবিস্কার নিউট্রিনো কী?
নিউট্রিনো ( /njuːˈtriːnoʊ/) হচ্ছে বৈদ্যুতিক চার্জবিহীন, দুর্বল সক্রিয় অশূন্য ভরের অতিপারমাণবিক কণা।যেকোন পর্দাথের মধ্য
দিয়ে কোন অবস্থায় এই কণা প্রায় অবিকৃতভাবে নি:শব্দে কোন প্রকার
প্রতিক্রিয়াবিহীন অবস্থায় চলাচল করতে পারে। নিউট্রিনো অর্থ হচ্ছে 'ক্ষুদ্র নিরপেক্ষ কণা'। গ্রীক বর্ণ নিউ (ν) দিয়ে একে প্রকাশ করা হযফ্রেডেরিক রাইনেস (/ˈraɪnɛs/
RY-nes; ১৬ মার্চ ১৯১৮ – ২৬ আগস্ট ১৯৯৮) একজন মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী ক্লাইড কাওয়ানের সাথে
যৌথভাবে নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য ১৯৯৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ
করেন।২০১৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার যায় নিউট্রিনো গবেষণার খাতে।
বিজয়ী বিজ্ঞানীরা হলেন, জাপানে তাকাআকি কাজিতা ও
কানাডার আর্থর বি. ম্যাকডোনাল্ড। নিউট্রিনো-ভরশূন্য ফোটনজাতীয় কোনো কণা
নয়-অশূন্যভরসম্পন্ন অতিপারমাণবিক কণা-এই রহস্য উদঘাটনের জন্য তাঁদের এ পুরস্কারে
ভূষিত করা হয়। কাজিতা ও ম্যাকডোনাল্ডের নোবেল পাওয়ার বিষয়ে রয়েল সুইডিশ
অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিউট্রিনোর
ভর নির্ণয়ে তাদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এ পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে
(গতি আবিস্কারের জন্য নয়)। (সূত্রঃhttps://bn.wikipedia.org/wiki/নিউট্রি
অতিপারমাণবিক কণাদের মধ্যে
নিউট্রিনো আশ্চর্য রকমের কয়েক প্রকারের নিম্নরূপ ধর্ম দেখায় যথা
১) নিউট্রিনো (প্রায়) ভরশুণ্য: নিউট্রিনোকে দৃশ্যত: ভরহীন (Mass less) মনে
হয়। তবে সূক্ষ্ম পরীক্ষায় দেখা গেছে নিউট্রিনোর অত্যন্ত ক্ষুদ্রতর ভর আছে। ভরত্ব
ইলেকট্রনের ২.৫ লক্ষ ভাগের মাত্র এক ভাগ । অর্থাৎ নিউট্রিনোর ভর যেন থেকেও নেই।
২) নিউট্রিনো (প্রায়) মিথষ্ক্রিয়া বিহীনঃ কণারা সাধারণত মহাকর্ষ, তড়িৎ চুম্বকীয়, সবল এবং দুর্বল বল এই
চারটি মহাজাগতিক বলের মাধ্যমে মিথষ্ক্রিয়া করতে পারে অর্থাৎ অন্য কণাদের প্রভাবিত
করতে পারে বা নিজে প্রভাবিত হতে পারে। পক্ষান্তর নিউট্রিনো আধানহীন তাই
তড়িৎচুম্বকীয় মিথষ্ক্রিয়া দেখায় না। কোন কিছুতেই প্রভাবিত হয়না বলে নিউট্রিনো
সমস্ত কিছু ভেদ করে সহজেই চলে যেতে পারে। প্রতি মুহূর্তে বিলিয়ন বিলিয়ন
নিউট্রিনো আমাদের দেহ থেকে শুরু করে গোটা পৃথিবীটা, সৌরজগত, গ্যালাক্সি- সবকিছু ভেদ করে চলে ) ।
সার্ণের নিউট্রিনোর
ভূতুতে গতি আবিস্কারের ইতিকথা
‘প্রজেক্ট
অপেরা’ নামের এক বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের অধীনে ইউরোপীয়
পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র (CERN) কর্তৃক সাড়া
জাগানো নিউট্রিনোর গতিবেগ আবিস্কারের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। নিউট্রিনোর গতিবেগ
আবিস্কারের ক্ষেত্রে গৃহীত এক পরীক্ষার প্রথম ধাপে সুইজারল্যান্ডের সিনক্রোটোন
নামের একটি ভূগর্ভ যন্ত্রে প্রোটন কণা তৈরী করে তা গ্রাফাইটের ওপর নিক্ষেপ করা
হয়। এতে প্রোটন কণাগুলি ভেঙে কিছু জটিল কণা তৈরী হয়, যেগুলি অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষয় হয়ে মিউয়ন এবং মিউ নিউট্রিনো তৈরী
করে। এ কণাগুলিকে তখন লোহার ওপর নিক্ষেপ করা হয়। এতে মিউয়ন নিউট্রিনো বাদে অন্য
সব কণা প্রতিফলিত বা শোষিত হয়। মিউয়ন নিউট্রিনোগুলি সুইজারল্যান্ডের মাটি-পাথর
ভেদ করে প্রায় ৭৫০কিলোমিটার দূরে ইতালিতে পৌঁছায়। এই নিউট্রিনো লোহাও ভেদ করে
অনায়াসে এপার থেকে ওপারে ছুটে যেতে পারে আলোর গতির চাইতমজার ব্যাপার হলো যে, ভরবিহীন অর্থাৎ শুন্য ভরের (Mass-less) অধিকারী
আলোর কণাই সাধারণতঃ ভরপূর্ণ অতিপারমানবিক কণার চাইতে দ্রুতগামী হয়ে থাকে। কিন্তু
অশুন্য ভরের অধিকারী অর্থাৎ ভরযুক্ত নিউট্রিনো যার গতিবেগ নাকি ফোটনজাতীয় শুন্য
ভরের আলোকেও ছাড়িয়ে গেছে। অপেরা পরীক্ষণের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে যে, মিউয়ন নিউট্রিনোর গতি হলো আলোর গতির চাইতে অন্ততঃ ১.০০০০২৫ গুণ অর্থাৎ
৬০ ন্যানো সেকেন্ড বেশী। এখানেই বৈজ্ঞানিক জগতের চরম ও পরম বিস্ময়। এ যুগান্তকরী
আবিস্কারে পদার্থবিজ্ঞানে বিশেষ করে কসমোলজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড মডেল তথা
আইনস্টাইনের সুপ্রতিষ্ঠিত ও জগদ্বিখ্যাত সমীকরণ E=MC² (Theory of special relativity) বা
বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে ধস নামে। কারণ, এ তত্ত্বের
মূল কথা:“আলোর চেয়ে দ্রুতগতির কোন কিছু এ জগতে নেই”। অথচ এ তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে পদার্থ বিজ্ঞানের মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব
স্ট্যান্ডার্ড মডেলসহ তত্ত্বিয় পদার্থবিদ্যার অন্য সব তত্ত্ব আইনস্টাইনের special relativity তত্ত্বে কোন
প্রকার বিপদ বিপর্যয় ঘটলে তাতে বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ যতসব বৈজ্ঞানিক
তত্ত্ব-সূত্রাবলী ধসে পড়তে পারে-এ আশংকার মধ্যেই সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরের
কাছে ফ্রান্সের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান গবেষণা
কেন্দ্র Center for European Research of Nuclear (CERN) কর্তৃক সেপ্টেম্বর ২০১১ সালে অনেকটা যাদুকরীভাবে ঘোষণা করে বসে: “আলোর চেয়েও দ্রুতগতিতে চলে "নিউট্রিনো"।
আনুবীক্ষণিক জগতে অনিশ্চয়তা সূত্রের সত্যতা
আনুবীক্ষণিক জগতে অনিশ্চয়তা সূত্রের সত্যতা খুব ভালভাবে লক্ষ্য করা যায়।ইলেকট্রনের ভরবেগ সঠিকভাবে জানতে এমন ফোটন দরকার যার শক্তি কম বা দুর্বল, যাতে এটা ইলেকট্রনটির ভরবেগকে বিরক্ত করতে না করতে পারে। কিন্তু ঝামেলা হলো ফোটনের শক্তি এর কম্পাঙ্কের সমানুপাতিক। অর্থাৎ, কম শক্তির ফোটনের কম্পাঙ্ক কম তথা তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেশি হবে। এমন বড়সড় ফোটন ইলেকট্রনের অবস্থান ঠিকভাবে নির্ণয় করতে ব্যর্থ হবে, যেমন আমাদের হাত ব্যর্থ হয় টেবিলের অমসৃণ পৃষ্ঠকে অণুধাবন করতে। আবার আমরা যদি ছোট(তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কম তথা কম্পাঙ্ক বেশী) ফোটন ব্যবহার করি, তাহলে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মত, এটা ইলেকট্রনের অবস্থান ভালোভাবে নির্ণয় করলেও, এমন ফোটনের শক্তি বেশী থাকায় ইলেকট্রনের ভরবেগ পালটে দেবে। অর্থাৎ ইলেকট্রনের ভরবেগ নিশ্চয়তার সাথে কোনভাবেই নির্ণয় করা যায়না। প্লাংকের ধ্রুবক খুব ছোট বলে বাস্তব জীবনে অনিশ্চয়তা সূত্র আমরা অনুভব করি না বললেই চলে।কিন্তু আনুবীক্ষণিক জগতে অনিশ্চয়তা সূত্রের সত্যতা খুব ভালভাবে লক্ষ্য করা যায়।
ফোটন ব্যবহার করে ভরবেগ নির্নয়ে অনিশ্চয়তার জন্য এই নীতির নাম অনিশ্চয়তা নীতি। আর জার্মান পদার্থবিদ ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ এই মৌলিক নীতিটি আবিষ্কার করেন তাই এর নাম "হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি"।
কোনো কণিকার অবস্থান এবং ভরবেগ, একইসাথে নিখুঁতভাবে জানা সম্ভব না। অবস্থান নিখুঁতভাবে পরিমাপ করতে গেলে ভরবেগের মানে ভুলের পরিমাণ বাড়বে, আবার ভরবেগ নিখুঁতভাবে পরিমাপ করতে গেলে অবস্থানের মানে ভুলের পরিমাণ বাড়বে -- এই নীতিটিকে অনিশ্চয়তা নীতি বলা হয়। জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ এই মৌলিক নীতিটি আবিষ্কার করেন।
তথ্য কণিকা
►শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগ হলো
২৯৯৭৯২৪৫৮ মিটার/সেকেন্ড (প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার/সেকেন্ড, এখানে ৩ লাখ
কিলোমিটার/সেকেন্ড বলব)। অর্থাৎ শূন্য মাধ্যমে আলো ১ সেকেন্ডে ২৯৯৭৯২৪৫৮ মিটার
দূরত্ব অতিক্রম করে। ১ মিটার দৈর্ঘ্যের মানে হলো যে দূরত্ব আলো শূন্য মাধ্যমে
১/২৯৯৭৯২৪৫৮ সেকেন্ডে অতিক্রম করে, যা কিনা আমাদের দুই
হাতের কাছাকাছি। কারও উচ্চতাhttps://www.bigganchinta.com/space/position-of-the-earth-in-the-universe
সূত্র: নেচার
প্রতিটা পদার্থই কি আলাদা?
Comments
Post a Comment